আমাদের জাতীয় জীবনে দুই কীর্তিমান মা

  অনলাইন ডেস্ক

১৪ মে ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ফজিলাতুন্নেছা মুজিব

তিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহধর্মিণী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার জন্মদাত্রী মা। জন্ম ১৯৩০ সালে। মাত্র তিন বছরে বাবাকে আর পাঁচ বছর বয়সে মাকে হারান। শেখ মুজিবের মা সায়েরা খাতুন সে সময় থেকে তাকে বড় করতে থাকেন নিজের সন্তানের মতো। স¤পর্কে শেখ মুজিবের চাচাতো বোন হতেন বেগম ফজিলাতুন্নেছা। শেখ মুজিবের বয়স যখন কুড়ি, তখন পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় বেগম ফজিলাতুন্নেছার সঙ্গে। সেই থেকে তিনি শেখ মুজিবের জীবন সংগ্রামের সঙ্গে আমৃত্যু জড়িয়ে ছিলেন।

প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন স্থানীয় মিশনারি স্কুল থেকে। সে সময় মেয়েদের শিক্ষা নিষিদ্ধ থাকায় পরবর্তীকালে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ আর হয়ে ওঠেনি তার। ধৈর্য, দৃঢ়তা, প্রজ্ঞা আর বিচক্ষণতা শেখ মুজিবকে জুগিয়েছে সাহস আর অনুপ্রেরণা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার রাজনৈতিক জীবনের বেশিরভাগ সময়ই থেকেছেন জেলে, নয়তো রাজপথে। কখনো ভেঙে না পড়ে বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব অসীম ধৈর্যের সঙ্গে সংসার আর সন্তানদের পরিচর্যা করেছেন নিজ হাতে। দুই মেয়ে শেখ হাসিনা আর রেহানা, তিন ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল আর শিশু শেখ রাসেলের পরিচর্যায় কোনো ঘাটতি রাখেননি তিনি। সংসার সামলেছেন, অভাব-অভিযোগ করেননি কখনো। শুধু নিজের পরিবারই নয়, আত্মীয়স্বজনদের দেখাশোনা, দলের অন্য নেতাদের পরিবারে সাহায্য করতে কখনো নিজের গহনাও বিক্রি করতে হয়েছে। সন্তানদের লেখাপড়া আর ব্যক্তিস্বাধীনতায় কার্পণ্য করেননি।

ছেলেমেয়েদের করে গেছেন উচ্চশিক্ষিত। তার বড় ছেলে শেখ কামালের ছিল সংগীতে আর মেজ ছেলে শেখ জামালের ছিল খেলাধুলায় আগ্রহ। তিনি তাদের সব সময় অনুপ্রাণিতই করেছেন গঠনমূলক কাজ করতে। বড় মেয়ে শেখ হাসিনার সঙ্গে ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ স¤পর্ক। তার সাংগঠনিক গুণও ছিল অনন্য। জেলে থাকাকালীন বঙ্গবন্ধুকে প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া ও বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ কর্মীদের কাছে পৌঁছে দিতেন। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে প্রতিটি সফল আন্দোলনের সময় ছায়ার মতো পাশে থেকে শক্তি জুগিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে যখন সারা দেশ থেকে লাখো মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করছিল, তখন তিনি ও তার পরিবার গৃহবন্দি। এর মধ্যেই তার দুই পুত্র সন্তান শেখ জামাল ও শেখ কামাল পালিয়ে অংশ নেন যুদ্ধে। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বঙ্গবন্ধু ও বেগম ফজিলাতুন্নেছার

এই দুই পুত্র। সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত এই মহীয়সী নারী দেশ স্বাধীন হলেও কখনো বিলাসবহুল জীবনযাপন করেননি। সন্তানদেরও শিখিয়েছেন কীভাবে সাধারণ মানুষের পাশে থাকা যায়। বহু বীরাঙ্গনার বিয়ে দিয়েছেন নিজে দাঁড়িয়ে থেকে। অনেকের কর্মসংস্থান করে দিয়েছেন। নিজ সন্তানদের আলাদা করে দেখার সুযোগ পাননি কিন্তু তার মধ্যেও তিনি দিয়েছিলেন মানবতার শিক্ষা। সেই শিক্ষায় উজ্জীবিত বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা আজও দাঁড়িয়ে যান অসহায় মানুষের পাশে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের হাতে তার প্রাণপ্রিয় সন্তান, পুত্রবধূ ও নিকটাত্মীয়সহ তিনিও নৃশংসভাবে মৃত্যুবরণ করেন।

জাহানারা ইমাম

তিনি একাধারে সাহিত্যিক, সংগঠক, শিক্ষিকা। তার চেয়েও বড় পরিচয় তিনি শহীদ জননী। জন্ম অবিভক্ত বাংলার মুর্শিদাবাদের সম্ভ্রান্ত পরিবারে ১৯২৯ সালে। পিতা তৎকালীন ব্রিটিশ আমলের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। কন্যাসন্তানদের শিক্ষা তখনো পুরোপুরি প্রসার লাভ করেনি। আধুনিকমনস্ক পিতা আর ভাইদের তত্ত্বাবধানে শিক্ষায় হাতেখড়ি। কলকাতার লেডি ব্রাবোর্ন কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। ইঞ্জিনিয়ার শরীফ ইমামের সঙ্গে বিয়ের পর ঢাকায় চলে আসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এমএ ডিগ্রি নেন জাহানারা ইমাম। কর্মজীবন শুরু করেন সিদ্ধেশ্বরী গার্লস স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে। আট বছর দায়িত্ব পালনের পর স্কলারশিপ নিয়ে আমেরিকা যান উচ্চতর পড়াশোনার জন্য।

দেশে ফিরে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে শিক্ষকতা করেন। ১৯৬৮ সাল থেকে নিয়মিত হন শিশুদের জন্য লেখালেখিতে। ১৯৭১ সাল। বড় ছেলে রুমির আমেরিকায় ফুলব্রাইট স্কলারশিপ নিয়ে পড়তে যাওয়ার কথা। ছেলের দেশপ্রেম আর জেদের কাছে হার মেনে আমেরিকার বদলে যুদ্ধে পাঠান। যাওয়ার আগে বলেছিলেন, ‘যা, তোকে দেশের জন্য কোরবানি করে দিলাম। তুই যুদ্ধেই যা।’

আর ফেরা হয়নি তার মেধাবী সন্তান শাফি ইমাম রুমির। পাকিস্তানি পিশাচদের হা—ে নির্মমভাবে শহীদ হন রুমি। যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল তার আরেকটি সন্তান জামী আর তার স্বামী শরীফ ইমাম। তার স্বামী হানাদারদের প্রচ- নির্যাতনে মারাত্মক আহত হয়ে মুক্তি পেলেও মারা যান দেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই। মুক্তিযোদ্ধাদের নানারকম সাহায্য-সহযোগিতাই শুধু নয়, অনেক মুক্তিযোদ্ধার আশ্রয়স্থলও ছিল জাহানারা ইমামের বাসাটি। রুমির বন্ধুরা রুমির মা জাহানারা ইমামকে শহীদ জননী নামে ভূষিত করেন। যুদ্ধের সময় স্বামী-সন্তানদের জন্য উদ্বেগ-আতঙ্কের বিবরণ সে সময় টুকরো টুকরো করে লিখেছিলেন ছোট ছোট চিরকুটে। গা শিউরে ওঠা সেই বৈরী সময়ের কথা বই আকারে প্রকাশ করেন ১৯৮৬ সালে। স্বামী-সন্তান হারিয়ে অসহায় এই নারী থেমে থাকেননি স্বাধীনতার পর। আবারও মন দেন লেখালেখিতে। তার লেখা অনুবাদ ও মৌলিক গ্রন্থের সংখ্যা কুড়িটির বেশি। পেয়েছেন বাংলা একাডেমিসহ নানান পুরস্কার। ১৯৮২ সালে ক্যানসার ধরা পড়লেও ভেঙে পড়েননি। লড়াই করে গেছেন নতুন উদ্যমে। ১৯৯২ সালে একাত্তরের গণহত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে গড়ে তোলেন ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। কমিটির উদ্যোগে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রতীকী বিচারে যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের ফাঁসির রায় দেওয়া হয়। জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে শুরু হওয়া যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি জনগণের, বিশেষত তরুণদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। মূলত এরই ফলে ২০১৩ সালে সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও শাস্তি কার্যকর করা শুরু করে। জীবনভর যুদ্ধ করা এই সংগ্রামী নারী একজন শহীদের মা জাহানারা ইমামের দেহাবসান ঘটে ১৯৯৪ সালে, ক্যানসারের কাছে পরাস্ত হয়ে।

গ্রন্থনা : শামীম ফরহাদ

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে